banglanewspaper

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকা দুই সন্তানের বিষয়ে সমঝোতার পথে হাঁটতে রাজি আছেন সন্তানদের বাবা ইমরান শরীফ এবং মা নাকানো এরিকো। ৩১ আগস্ট মামলার শুনানির আগে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে সমঝোতা করতে চান তারা।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তেজগাঁওয়ের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে আসেন মা-বাব। সেখান থেকে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তারা এই কথা জানিয়েছেন।


এরিকোর পক্ষে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শিশির মনির বলেন, ‘যেহেতু পারিবারিক বিষয়, সেখানে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয় রয়েছে। এজন্য আমরা চেষ্টা করছি, আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি শেষ করা যায়। আমরা আশা করি দ্রুত সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে কাছাকাছি আসতে পারবো।’

এসময় এরিকো বলেন, ‘সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সমঝোতায় রাজি হয়েছি। বাচ্চাদের দেখে এলাম, তাদেরকে হাস্যোজ্জ্বল দেখেছি। নিজ হাতে তাদের গোসল করিয়েছি।’

এদিকে একই স্থানে এসে সন্তানদের জন্য চোখের জল ঝরিয়েছেন বাবা ইমরান শরীফ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনিও সমঝোতায় রাজি আছেন বলে জানান।

ইমরান শরীফ বলেন, ‘এখানে বাচ্চারা ঠিকমত খেতে পারছে না। এজন্য একটু ভালো থাকার জন্য কোনো ভালো হোটেলে নিয়ে যেতে চাই। সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য যেকোনো সমঝোতায় বসতে রাজি আছি। সমঝোতার পর ফলাফল কী দাঁড়ায় তার ওপর পরবর্তী বিষয়গুলো জড়িত রয়েছে। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব আমার বাচ্চাগুলো যেন ভালো থাকে।’

২০০৮ সালের ১১ জুলাই জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো (৪৬) ও বাংলাদেশি আমেরিকান নাগরিক ইমরান শরীফ (৫৮) বিয়ে করেন। জাপানি আইন অনুযায়ী বিয়ে করে তারা বাসবাস শুরু করেন দেশটির রাজধানী টোকিওতে। এক যুগ সংসার করেছেন তারা। এরমধ্যে তাদের সংসারে এসেছে তিনজন কন্যাসন্তান। এরিকো-ইমরান দম্পতির সন্তানরা হলো —জেসমিন মালিকা (১১), লাইলা লিনা (১০) ও সানিয়া হেনা (৭)।

জাপানি নাগরিক এরিকো পেশায় একজন চিকিৎসক। মালিকা, লিনা ও হেনা টোকিওর চফো সিটিতে অবস্থিত আমেরিকান স্কুল ইন জাপান (এএসআইজে)-এর শিক্ষার্থী ছিল।

২০২১ সালের ১৮ জানুয়ারি শরীফ ইমরান এরিকোর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের (ডিভোর্স) আবেদন করেন। এর তিন দিন পর ইমরান এএসআইজে স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ এরিকোর সম্মতি না থাকায় তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরে ইমরান তার মেয়ে জেসমিন ও লিনাকে স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপ থেকে অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান।

২৫ জানুয়ারি শরীফ ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছে তার বাচ্চাদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো তা প্রত্যাখ্যান করেন।

২৮ জানুয়ারি এরিকো টোকিওর পারিবারিক আদালতে তার বাচ্চাদের জিম্মার অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চেয়ে মামলা করেন। আদালত ৭, ১১ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি শিশুদের সঙ্গে পারিবারিকভাবে দেখা করার আদেশ দেন। ইমরান শরীফ আদালতের আদেশ ভঙ্গ করেন এবং মাত্র একবার মায়ের সঙ্গে দুই মেয়ের দেখা করার সুযোগ দেন।

৯ ফেব্রুয়ারি মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট পান তিনি। ২১ ফেব্রুয়ারি ইমরান তার দুই মেয়ে জেসমিন ও লাইলাকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

দুই মেয়ের বিবৃতি ও সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে টোকিওর পারিবারিক আদালত গত ৩১ মে এরিকোর অনুকূলে জেসমিন ও লাইলার জিম্মা হস্তান্তরের আদেশ দেন। বিষয়টি নিয়ে এরিকো বাংলাদেশের একজন মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করেন। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারনে তিনি বাংলাদেশে আসতে পারেননি। গত ১৮ জুলাই এরিকো শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

এরিকো বাংলাদেশে কোভিড পরীক্ষা করান, যার ফলাফল নেগেটিভ আসে। কিন্তু ইমরান রিপোর্টের ফলাফল অবিশ্বাস করে তার সঙ্গে সন্তানদের দেখা করাতে অস্বীকৃতি জানান।

২৭ জুলাই এরিকোকে তার মোবাইল সংযোগ বন্ধ ও চোখ বাঁধা অবস্থায় মেয়েদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হয়। একই অবস্থায় তাদের গাড়িতে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয়।

তাই আইনি প্রতিকারের আশায় হাইকোর্টে দুই মেয়ের জিম্মা চেয়ে রিট দায়ের করেন এই জাপানি মা। রিট আবেদনে দুই শিশুকে তাদের মা এরিকোর জিম্মায় দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়।

আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত এই দুই সন্তানকে রাজধানীর তেজগাঁওস্থ ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এ সময় প্রতিদিন সকালে মা এবং বিকেলে বা তাদের সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে পারবে এবং সময় কাটাতে পারবে, এমন নির্দেশনাও দিয়েছে আদালত। আর বিষয়টিকে সমঝোতার মাধ্যমে সমাধান করতে এরিক ও ইমরানের আইনজীবীদের বলেছেন আদালত। ৩১ আগস্ট আদালতে এই রিটের শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ট্যাগ: bdnewshour24