banglanewspaper

সব পেশাতে এমন কিছু মানুষের দেখা মেলে যারা কর্মগুণে অন্যদের চেয়ে অনেক ঊর্ধ্বে তুলে নেন নিজেকে। চিকিৎসার মতো মহৎ পেশায় এমনই একজন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। এই বাঙালি চিকিৎসক বাংলাদেশে বিপুল সুনাম কুড়ানোর পাশাপাশি একজন মহৎ চিকিৎসক হিসেবে নিজের একটি জায়গা তৈরি করেছেন পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।

পেশাগত ব্যস্ততার মাঝেই সমাজসেবা আর রাজনীতিতেও মনোযোগী প্রাণ গোপাল দত্ত। বৃহত্তর মানুষের কল্যাণের জন্য জাতীয় সংসদে যেতে চান জনপ্রতিনিধি হয়ে। তার এই ইচ্ছাকে মূল্য দিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। আসন্ন কুমিল্লা-৭ আসনের উপনির্বাচনে দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. প্রাণ গোপালকে।

কুমিল্লায় জন্ম নেওয়া ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত তিন যুগের বেশি সময় ধরে চিকিৎসাক্ষেত্রে অনন্য অবস্থান তৈরি করেছেন। শুধু চিকিৎসক হিসেবেই নন, নিজের যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন প্রশাসক হিসেবেও। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) অবকাঠামোগত ও চিকিৎসাসেবায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চ্যান্সেলরের (ভিসি) দায়িত্ব পালনকালে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত টানা দুবার তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।

প্রাণ গোপাল দত্ত বদলে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। বদলে দিয়েছেন হাসপাতালের চিত্র। বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে দলীয় আগ্রাসন আর দুর্নীতি-লুটপাটে এই চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়টির সুনাম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পরে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের ব্যানারে একটি চক্র পুরনো কায়দায় আধিপত্য বিস্তার, নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে সর্বত্র খবরদারি জারির উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু উপাচার্য অধ্যাপক ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত তা নিয়ন্ত্রণ করেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সমর্থন দিয়েছিলেন তাকে। চারদিকে যখন নানা নেতিবাচক খবর, তখন বিএসএমএমইউ মাথা উঁচিয়ে দাঁড়ায়। যার নেতৃত্বে ছিলেন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত।

হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও অন্য কর্মীদের সময়মতো উপস্থিতির বিষয়ে নিজেই দেখভাল করতেন উপাচার‌্য ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা দখলবাজদের হাত থেকে উদ্ধার, গাড়ি পার্কিংসহ ১০টি ব্লক তৈরি, জায়গার পরিমাণ ১৪ দশমিক ৫ থেকে ১৮ দশমিক ৫৭ একরে উন্নীতকরণ, দলবাজি-স্বজনপ্রীতি বন্ধ, মেধা-যোগ্যতা ও আইন-বিধিকে প্রাধান্য দেওয়া, রোগীদের জন্য হাসপাতালের আউটডোরে মেডিসিনের দেশসেরা অধ্যাপক এম আবদুল্লাহসহ স্বনামধন্য চিকিৎসকদের বৈকালিক স্পেশালাইজড কনসালটেশন সার্ভিসে চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করেন তিনি। তার এই কাজে চিকিৎসকরা যেমন সহযোগিতার হাত বাড়ান, তেমনি তার নির্লোভ, নিরহংকারী, দক্ষ নেতৃত্বের গুণে অলস কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ঘুম ভাঙে।

এছাড়া হাসপাতালের ২০টি বিভাগে স্পেশালাইজড কনসালটেশন সেবা চালু করেন তিনি। ২০১১ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত এক লাখ ২৬ হাজার ৭৬৪ জন রোগীর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়।

প্রাণ গোপাল দত্তের নেতৃত্বে হাসপাতালের বেড এক হাজার ১৫০ থেকে এক হাজার ৫০০-তে উন্নীত হয়। আইসিইউর বেড ছিল ১৬টি, এখন ৪৬টি। সিসিইউর বেড ছিল ১৪টি, এখন ৩০টি। কেবিন ছিল ৬৬টি, এখন ১১০টি। সাড়ে ছয় কোটি টাকা মূল্যের একটি সিটিস্কান মেশিন, আট কোটি টাকা মূল্যের একটি এমআরআই মেশিন এবং দুটি অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়। পরিবহন পুলে গাড়ির সংখ্যা ছিল আগে ১১টি। বর্তমানে নিজস্ব অর্থায়ন ছাড়াও অনুদান থেকে তা বাড়িয়ে ২০টি করা হয়েছে।

ডা. প্রাণ গোপাল বলেন, রোগীদের মনে করতে হবে দেবতা। হাসপাতালকে ভাবতে হবে উপাসনালয়ের মতো পবিত্র স্থান। তাহলে এ জাতি দিয়ে কিছু করা যেতে পারে।

নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেলেও অত্যন্ত সাদাসিধা জীবনযাপন করেন এই যশস্বী চিকিৎসক। রাজধানীর গ্রিন রোডের গ্রিন লাইফ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় তার চেম্বার। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের সঙ্গে তার আচরণ শিশুর মতো।

রোগীদের মতে, শিশুদের ভয় দূর করতে ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত অনন্য। ধনী-গরিব নয়, রোগীকে কেবল রোগী হিসেবেই দেখেন তিনি। সবার সঙ্গে কথা বলেন হাস্যোজ্জ্বল মুখে। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষকে সমান সমাদর করেন ডা. প্রাণ গোপাল।

১৯৫৩ সালের পহেলা অক্টোবর কুমিল্লার চান্দিনার মহিচাইল গ্রামে কালাচান দত্তের ঘরে জন্মান প্রাণ গোপাল দত্ত। দাদা অশ্বিনীকুমার দত্ত সে আমলে পাস করা ডাক্তার ছিলেন। ফলে তাদের বাড়িটা ডাক্তারবাড়ি হিসেবেই চিনত সবাই।

১৯৬০ সালে প্রাথমিকে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ও ১৯৬৩ সালে মহিচাইল হাইস্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে চান্দিনা পাইলট হাইস্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে। ১৯৬৮ সালে ৫ বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্ক নিয়ে মেট্রিক পাস করেন তরুণ প্রাণ গোপাল। ১৯৭০ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রার বছর শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। মহান মুক্তিযুদ্ধে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন প্রাণ গোপাল। দেশ স্বাধীন করে বীরের বেশে ফেরেন তিনি। এরপর শুরু করেন মেডিকেলে পড়াশোনা। ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করেন। ১৯৮১ সালে ঢাকা থেকে এফসিপিএস এবং একই বছর অটোলারিঙ্গোলজি (নাক, কান, গলা) বিষয়ে এমএস করেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ওদেসা স্টেট মেডিকেল ইনস্টিটিউট থেকে।

১৯৮৩ সালে তিনি যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে অডিওলজিক্যাল মেডিসিন বিষয়ে এমএসসি করেন। ২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস থেকে এফআরসিএস ফেলোশিপ অর্জন করেন। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান অ্যান্ড সার্জনস তাকে এফসিপিএস ফেলোশিপ দেয়।

চিকিৎসাসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পদক লাভ করেন তিনি। ১৯৯০ সাল থেকে তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চিকিৎসা করে চলেছেন তিনি। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদেরও চিকিৎসা করেন প্রাণ গোপাল দত্ত।

স্কুলজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। শিক্ষাজীবনের পুরো সময়টা তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। তবে রাজনীতির কারণে পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটেনি তার।

এই চিকিৎসক ও রাজনীতিক একাদশ সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৭ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলের মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন। নিয়মিত প্রচার-প্রচারণায়ও সময় দিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পান প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক আলী আশরাফ। তিনি বিজয়ীও হন।

সম্প্রতি আলী আশরাফ মারা গেলে তার আসনটি শূন্য হয়। আগামী ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত। শনিবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, তিনি সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করবেন। উপনির্বাচনে আরও যারা মনোনয়ন চেয়েছিলেন তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

ডা. প্রাণ গোপাল দত্ত বলেন, ‘প্রয়াত সাংসদ আলী আশরাফের ছেলে টিটুর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সে আমার সঙ্গে আছে বলে জানিয়েছে। আসলে তার (টিটু) কর্মী বা তার আব্বার (আলী আশরাফ) কর্মী বা আমার কর্মী, সবাই তো শেখ হাসিনার কর্মী।’

ট্যাগ: প্রাণ গোপাল দত্ত প্রধানমন্ত্রী